আশির দশকের বিস্মৃতপ্রায়,ব্রাত্য ..আত্মমগ্ন দুই কবি রঞ্জন সরকার ও উৎপল দে ৷
রঞ্জনের কবিতার জগত বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে এক বিরল অনুভূতি ৷যেখানে পাতার ওপর তারাদের চোখ বিঁধে থাকে... সন্ন্যাসীর ধুনি জ্বলে ওঠে মন্ত্রচ্চারণে ৷ আর সুদূর মানচিত্রের ব্যাপ্তিতে আবিষ্ট , মোহময় উচ্চারণে রঞ্জনের কবিতা কাঠের পুতুলের মতো ডুবিয়ে নেয় এক টাইম মেসিনে ..
রঞ্জন সরকারের কবিতা
গ্রাস
[]
জাল রহস্যের বুকে উঁকি মারে চাঁদ
পিশাচের গর্ভগৄহ ,বন, তাকে গিলে ফেলে মেলে ধরে পায়ের জমিতে
রহস্য শুরু হোক -
পেনসিলভানিয়া থেকে ফেরা খনিযুবকেরা ক্যাম্প ফেলে আছে আজ গাছের তলায়
শিখা ও শিশির কণা দোলে ,গ্রাস করে তাঁবু ,মাথা
কালো ঘাম ঝরে যায় পথে
অশ্রুত বাঁশির শব্দে জেগে উঠে পাথুরে মরদ ভাবে -
কাল ফিরে এল নাকি ?এতদিনে
তবে এ শরীর ছেড়ে চলো ওই পারে ,উপকূলে
শৈশব,দূর স্মৃতি নিরঞ্জনে ফুল ও বালিকার দল মালা হাতে
মনে হয় এখনো গলার কষ বসে আছে
চকিতে ঘোরায় ঘাড়,মালিকেরা কেউ নেই ফাঁকা তবে এই গ্রহ
ডেভিল্যাম্প ,পাগল চাবুক -প্রেতপুরী দূরে সরে যায়
আট ঘন্টার শেষে ফাঁকতালে শুরু হোক নাচ !
অবসরে ভালোবাসা হবে ঢের,কুহেলী গুণ্ঠন খুলে ছুটে আসে
রাত, বায়ু,মায়াকুমারীরা ;ডাক দেয়-ফণা তোলে
শিখা ও শিশিরকণা ,এখনই সুযোগ বুঝে ফেলে জাল ,গ্রাস করে তাঁবু
সারা রাত একটু একটু করে খেয়ে নিলো সব্বার মাথা
আয়ু ফুরোবার কালে জল রহস্যের বুকে ফের উঁকি মারে চাঁদ , দেখে যে
বহুকাল পর আজ আবার মদ ও হৃদপিণ্ডের রস ডুবে আছে ক'জন মরদ
শিখা
[]
ঝড় থেমে গেছে সবুজ শিখাটি ফের জ্বলে উঠে চরের জমিতে
পাতার ওপরে ফিসফাস তারাদের চোখ বিঁধে যায়
কিছু ছাপ মাটিতে পায়ের,কে যেন গিয়েছে দূরে- দরমায় আঁচড়ের শব্দ
নীল ধূলো পার হয়ে নেমে আসে বায়ুযান ..হ্যাচ খুলে গেছে একে একে
করিডোর ...করিডোর জুড়ে অন্ধকার
পলিত বটের পাতা পড়ে আছে ,শাখাঝুরি..জ্জলে ওঠে সন্ন্যাসীর ধুনি
মন্ত্রপাঠ কানে আসে..
তরঙ্গ উঠেছিল কবে
আজ ঘর জুড়ে শুধু নৈঃশব্দ,দেয়াল মেঝেতে ধুলো জমে আছে
দুজনেই চুপচাপ বলে , এরকম কতদিন ?
কতদিন আগে মেয়েটির চোখে জল , কাল ভোরে চলে যাবে ঘর ছেড়ে
নাহারকাটিয়া ৷...দূরের সড়ক ঘুরে পথ গেছে ..বাস যাবে
তারপর সংবাদ নেই
মৃত ছেলেটির দেহ পাওয়া যায় পাটের পুকুরে , ভোরবেলা
সেই সাক্ষী জল ও নুনের ,তারপর সংবাদ নেই
শুধু পথের ওপর পড়ে পুড়ে গেছে ধূসর, শরীর
সন্ধ্যায় গাঢ় চর
তারাদের চোখ জ্বলে, কবে যেন এসেছি একা এদিকেই
দূরে ব্রীজ শ্মশানের ওপাশে নদী..সকাল কি বিকেল ডুবে আছে কুয়াশায়
একটি লন্ঠন জ্বলে রাতে ,মৃত কুঁড়ে ! যে থাকে তাকেও দেখে নি কেউ
শুধু রাতে ,একটি চোখের ছবি ভেসে ওঠে
কঠিন বিবর্ণ কেউ শিলালিপি লিখে চলে, হিজিবিজি হলুদ প্রলাপ
সারারাত বিষণ্ণ রক্তের ধোঁয়া উড়ে যায়
কতদূর নাহারকাটিয়া..
তারও আগে অচেনা অদ্ভুত আলো নেমে এসে পড়েছে মাটিতে,খিলানের কাঁচ বেয়ে
নীচে বৃত্তাকার জমি
বাঁকা শিং ভীষণ মহিষ থেকে দূরে বল্লম হাতে,কে এক বালক
দারুণ যুদ্ধ হবে, লোকারণ্য..ভরে গেছে আম্ফিথিয়েটার
সহসা চীৎকার করে যে ছুটে এসেছে , যেন সেই রাজার দুহিতা
ভীষণ মহিষ থেকে সরাবেই দূরে..
ওই যে বালক ! যেন তারই কেউ ছিল
কতকাল আগে, কিংবদন্তীর ফল চুরি করে ঢুকে যেত ভূতের বাগানে ৷
উৎপলদের কবিতা
পদ্মগন্ধ
কবি নই.. লম্পট হয়ে যাই ।চুমু খাই লক্ষীছাড়া ছুঁড়িদের
কুলুঙ্গিতে কালি ওঠা পিলসূজ -পূর্বপুরুষের ।থুথু লালায় মাখা সন্তান ।মোহিনী সাজা স্ত্রী
বলো, প্রতিদিন ভালো লাগে কারো !
এয়োতি সিঁদুর মাখা গাল ..ফিসফিসে কথা
কেউ নই কেউ নই , পদ্মগন্ধের ওমে মাতোয়ারা
মুখচোরা গেঁয়ো লোক বাড়ি ফিরি-শেষ রাতে ।
প্রসব
চার প্রহরের পর কেউ কথা বলছি না ..নেশায় নেশা
চুল খসে , চোখে সিঁদুরের গুঁড়ো ।ভোরবেলা
জ্বর আসে খুব ।মধুমতি চুল -আমাকে পাগল করে হাসে ।
নুন ছিটে দিই ..পিঠে কালসিটে
মা আমার কবে বড়ো হবি , কবে সারিয়ে তুলবি আমায় !
দরজা আগলে কালু মাস্তান ..যদি না ই ফিরি
সাট্টার দলে , মালের আসরে !
আজ , প্রদীপ নিবিয়ে দিই -ফুঁয়ে ।সিঁথি রাঙা
পরীমেয়ে ঘুমিয়েছে পাশে ..হিরেকুচি রূপ ,
নাকছাবি জ্বলে ..জন্ম হয় ফুলপাখি , আনন্দের কুসুম..
No comments:
Post a Comment