অন্যদ্রাঘিমা

অন্যদ্রাঘিমা
প্রচ্ছদ - অদীপ ঘোষ

Monday, 21 July 2014

অন্যদ্রাঘিমা 

বিশেষ সংকলন ১৯৮৩

(নির্বাচিত অংশ) 

 

 

 

সূচীপত্র  

মণীন্দ্র গুপ্ত , দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় , রঞ্জিত সিংহ , দেবদাস আচার্য , কালীকৃষ্ণ গুহ , নারায়ণ ঘোষ , বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় ,

অমিতাভ মৈত্র , জমিল সৈয়দ , জয় গোস্বামী , সঞ্জীব প্রামাণিক , রাজকুমার রায়চৌধুরী , চন্দন মুখোপাধ্যায় , 

মল্লিকা সেনগুপ্ত , গৌতম বসু , অলোকনাথ মুখোপাধ্যায় , হীরক ভট্টাচার্য , 

রঞ্জন সরকার , উৎপল দে ।   

প্রচ্ছদ / অদীপ ঘোষ  

মূল্য - ৩ টাকা

মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতা  

জটিল ফাল্গুন 

অলখ্যের নড়াচড়া টের পাও ,মেধাবিনী ? 
গর্ভে কি মুষল ,নাকি আলোরশ্মি ? 
রাত্রি নীহারিকার ঘূর্ণিতে পড়ে গিয়েছিলে মুগ্ধ পাঁচ মাস 
যেন মেরু-বোরিয়ালিসের বিশাল পর্দার পাশে মাত্র দুইজন

কিন্তু যা নিয়ে ফিরলে ,তার সংজ্ঞা জানো ?
শুধু স্মৃতি - যেন জলের তলায় ছুরি , বাকি যা তা অনির্বচনীয়

বিকেলের কলে জল পড়ে যায় ...
পাড়ার সানাই বকুলতলার দিক থেকে
ছায়া সঙ্গে করে আসে ,তোমার উঠোনে
অবসন্ন সূক্ষ - লেস ব্রেসিয়ার মরালের মতো সাদা
ভেসে আছে হাতের কাছেই , তবু গা ওঠে না ।
শুুধু ওক পাতা , ঝরনার জল খেয়ে যে ছিল একলা
তার ছবি বই দড়ির হ্যামক গুছোতে যাবে না আর এবছর টিলার বাড়ীতে
সে এখন শূন্য ঘরে ভেবে যাচ্ছে জন্ম হ্রাস করার প্রক্রিয়া -
জানলা দিয়ে অবলোকিতেশ্বরের আলো আসে ,
টেবিল , চেয়ার , বই ,অলেপ , নরম 
সে এবং জীবনের ভুল শ্যাম-যমজের মতো মারাত্বক যুক্ত ছিলো ,
আজ কর্ড ছিঁড়ে , টেবিলেতে , পরস্পর বিদায় নেবার আগে
মুখোমুখি বসে আছে তারা ।

             বিকেলে কলের জল পড়ে যাক -
             টক চেরী খেতে ইচ্ছে করে ?
             অন্য গন্ধে শরীরে বিষাদ উঠছে ভরে ।
             গর্ভের ফুলের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা পাখী অন্ধকারে ডাকে
             পাখী ডাকে ।     

দেবীপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায়ের কবিতা

মাঝ-পরিচ্ছেদ 

ফাটা শান বোবানো বিছনায় 
ভাঙাচুরো অসুখ নৃহাড় ।
দুপুর খস্ খস্ টানা মাঝ-পরিচ্ছেদে 
শুকনো ঝুর্ ঝুর্ করছে খসা ডানা ডাল ,
দ্রব হয়ে যায় নির্বাতাসে ।
মা তার সন্তান তার বাবা 
সুন্ সান্ সড়ক ছেড়ে পোকার জঠরে 
পোকা হয়ে ঢুকে গেল । ঘড়ি 
স্থির করে দেখছে  বিশাল নাইনল 
ফাঁসনল পেতে বসে ব্যাধ ।
নর নয় পক্ষধর নয় । 
আহ্লাদ উগরে চারধার জুড়ে নড়ে চড়ে ওঠে 
ভাঙাচুরো অসুখ নৃহাড় ।
কার ? কবে কার ? কারো নয় । 
দুপুর খস্ খস্ ঝুলছে মুখের ওপর । 



কালীকৃষ্ণ গুহের কবিতা

সাইকেল রিক্সা 

রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে যখন পেয়েছি ভয় , তখনই 
সাইকেল রিক্সা উড়ে এসেছিল ।
রিক্সার চালক ছিলো কৈশোর অতিক্রান্ত , বুদ্ধিমান ,আর্ত স্বপ্নচারী ।
সেই আনলো পরীদের দেশ থেকে আমাকে এখানে - প্রতিবেশী অন্ধদের পাশে ।

এখন এখানে সকলকেই ধীরে ধীরে চিনতে পারছি ।

 জয় গোস্বামীর কবিতা 

ক্ষত

তুমি যে আমার ছাল চেঁছে নিলে আঙ্গুলে , নখরে , ছুরিকায় 
আর কাটা জায়গায় মাখালে যে রান্নার লবণ ,
তুমি শুধু একা নও , তোমাদের তিনভাই -দু'বোন
সবাই যে আমাকে দিয়ে আঁচ দিলো ঘরের আখায় ,
বের করে নিলো কয়লা - আমি কি কিছু বলেছি একবারও ? 
শুধু পথে পড়ে আছি মৃত-শামুকের ভাঙা খোল , 
ফের যদি ছুঁতে যাও অন্য কোনো গাছের বাকল  
পায়ে ঢুকে যাবো সোজা - যাতে তুমি দাঁড়াতে না পারো !

চর্বিরা কুঞ্চিত হচ্ছে , আমি দেখবো , মাংসেরা আমাকে
চেপে ধরছে বারবার । ভিতরে ঘনতর পুঁজে
ভরেছে আঙুরফল । রূপোরস গলানো লাভায়
আমি যেন গেঁজে উঠছি । রক্তবাহী প্রধান শিরাকে
চিনে বের করছি আমি ,আর তার মাদক আভায়
মুগ্ধ হয়ে উঠে যাচ্ছি তোমার হৃদপিণ্ড খুঁজে খুঁজে ..

রঞ্জিত সিংহের কবিতা

আত্মজীবনী মূলক

লক্ষ ওয়াটের বাতি জ্বলছে তার দেহে ।
মনে হচ্ছে ,ক্যামেরা প্যান্ করতে করতে 
হঠাৎ বিশাল ঝাড় লণ্ঠনের সামনে আমাকে 
দাঁড় করিয়ে দিয়েছে । 
ক্রমে ঘিরে ফেলছে দীপগাছ
স্ফুলিঙ্গের পত্ররাশি -
'ভয় কি ,আমি তো রয়েছি এখনো্ ,
মাভৈ বলে এবার এগোও ,এগোও '।

কিন্তু আমার এ চামড়া-মোড়া এ বাসায় কখনো
ইলেকট্রিক ওয়েরিং হয় নি । হ্যাঁ ,মিস্ত্রি ও দেখে গিয়েছিল ।
হেসে বলে গেছে -এ যে স্যার ,চামড়াও নয়  সবটাই মাটির
এতে আলো জ্বলবে না ।

মনে পড়ল , ঠিক ঠিক ,উনি তো বলেছিলেন ,
মজবুতি দেয়াল বানাও ,
হাড়ে ইঁটের গাঁথনি ,মাংসে পলেস্তারা ।
তারপর ওয়েরিং সহজেই হয়ে যাবে ।
বাতি জ্বলবে -ঝাড়লণ্ঠনের রাজ রাজেশ্বর আলো ।

রাবণের যেমন স্বর্গের সিঁড়ি করা হল না অথচ
সীতা হরণে একটুও তর সয় নি ,তেমনি আমার দেয়ালও
পাকা হল না ,বিজলীও জ্বলল না ।
অথচ ক্ষোভ দুঃখের ভুসোকালির অন্ধকার রঙে
একটা চওড়া ড্রপ সীন বানিয়ে ফেলেছি ।
দরজা নেই , দরজা মতন  একটা ছোট ফোঁকরের মধ্য দিয়ে
রোজকার চলাচল ।
মাথা নিচু করে সকালে সুড়ুৎ করে বেরিয়ে সন্ধ্যায়
হেঁট মুণ্ড-সেই ভাবে ঢুকে পড়ি ।
চোখ বুঁজলে দেখি , একটা মস্ত বড় বাতি শূন্য পথে
আকাশ পেরিয়ে চলে যাচ্ছে ভাসতে ভাসতে
হাত বাড়াচ্ছি ..হাত বাড়াচ্ছি ..
কিন্তু কোথায় কি ?    

গৌতম বসুর কবিতা

হাসপাতাল

১
একজন ছুঁয়ে থাকে তার জরা , চশমার খাপ 
দেখতে দেখতে বস্ত্রে বাক্স ভরে ওঠে ; যাকে 
ভিন্ন দেশে যেতে হবে তার চিরুনী ,
সংবাদপত্রে মোড়া গেলাসে অন্য পথে যায় 
ফিরিয়ে আনে ঘাতক মেষপাল ।

২
এই রোদ , লক্ষ্য করো ,শ্বেতাঙ্গিনীর শব্দে
চোখ মেলছে ,দৃষ্টি আমার দিকে নয় 
দেয়ালের দিকে নয় , আলো স্যালাইনের 
বোতলে প্রবেশ করে ক্ষীপ্র গতি লাভ করছে 
এইভাবে রশ্মি ও জলের ফাঁসি সংগঠিত হয় । 

Sunday, 20 July 2014

নারায়ণ ঘোষের কবিতা 


অবশেষ 

এইখানে অবশেষ পড়ে আছে তলানীর মতো
সবকিছু ভেঙে গেছে ছত্রখান , শব্দের বাগান আর ভয়হীন ভয় 
চোখের কার্নিশ চুঁইয়ে নেমে আসছে জল আর অন্ধকার ।
ঘর শূন্য । তার মধ্যে ঘুরছে মাকড়সা ।
জানালা বদ্ধতায় ঘূণ । কিন্তু দরজা খোলা ; যেন 
শূন্য আস্তাবল পড়ে আছে । যেন সব ঘোড়া 
ছিটকে গেছে প্রান্তরের দিকে । সেখানে মানুষ নেই ।
উজ্জ্বল বাগান নেই । 
সব শিলীভূত । 
শুধু রক্তমাখা জামা পড়ে আছে কিছু  ।
এইভাবে সন্ধ্যা গড়িয়ে নামে নক্ষত্রবিহীন রাত
এইভাবে প্রতিটি বাস গড়িয়ে নেমে যায় নয়ানজুলির জলে 
এইভাবে পড়ে থাকে অবশেষ , শূন্য ঘর , শূন্য বুক ,
                                  জন্মপত্র ,ঠিকানাবিহীন রেশন কার্ড আর 
                                                  কবিতার কয়েকটা লাইন   

চ্ছিন্ন পাতা উড়ে যায় ভালোবাসার মতোন ...

অলোকনাথ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা 

আমি যাই 

সবাই যেখানে যায় 
              আমি যাই , জামার পকেটে
দুপুরের শান্ত শাদা ফুল -আমি যাই
যেখানে , সবাই যায় -অনন্ত দুপুর আয়
বালক ঘোরায় চাকা -
                   সমস্ত রাজ্যের
ধুলোকাদা পায়ে মেখে বালক যেখানে যায়
                           আমি যাই
সেখানে , সবাই যায় -
ইজেরের ফুটো -তার সর্বস্ব নিজের
                               দুলে ওঠে-উদাসীন
হাসে কি পৃথিবী ! -হাসে
দুপুরের শান্ত সাদা ফুল !


চন্দন মুখোপাধ্যায়ে কবিতা


অনল 

আগুনের মধ্যে গিয়ে কখনো দেখিনি 
কতো তীব্র হতে পারে দাহ 
এটুকু দেখেছি শুধু কি ভাবে পুড়েছে তোর মুখ 

কখনো দেখিনি আমি কত ঘন হতে পারে লাল 
শুধু জানি স্টিলের গ্লাসের মত 
ঝকঝকে ছিল মুখ , যা পুড়েছে আজ 

আমি দেখিনি ওই নীল শূন্যে বারুদের অণু 
কবে যে তড়িৎ হ'য়ে নেমে এল আমাদের ঘরে 
আজ শুধু পুড়ে যাওয়া মুখটাকে দেখি ।

রাজকুমার রায়চৌধুরীর কবিতা 


সমর্থন 

পাতাবন ঘিরে নামে অন্ধকার 
রুমা নামে কুমারী মেয়েটি কি জানে প্রভু আমার নাম ?
দেখো অই দেখো , পলাশীর যুদ্ধের ঘোরালো সাতনলা বন্দুক নল 
ডেকো না নীল পালকে মোড়া অরণ্য পাখিকে আর ।
ভয় হয়্‌ , শুধু ভয় হয় কেঁপে ওঠা পলাশীর ইতস্ততঃ পোড়া গাছের পাতা 
কোন রাখাল বালক সন্ত্রাস গাভীর ডাকে নেয় কি ? আনমনে -
১৭৫০ সালের ঝলসানো লতাপাতার জালের ভিতর মৃত হাড়কাঠ 
অপ্রস্তুত ভাবে কে ডাকে , ডাক নামে আমায় ? 
                                            আয় ..আয়..আয় 
কোমরে জড়ানো পালকের পোশাক খুলে এদিকে আয়..আয় 
যেতে শুধু ভয় হয় , কেঁপে ওঠে গাছের শরীর জুড়ে গাছপাতা ,
                                          চারদিকে উড়ে আর্তশিস্ ।
ভৌতিক চাঁদ অহংকারে উড়ায় একরাশ পাতার পিছনে শেষ রাতের আলোর- 
এলোমেলো মায়া বিন্দু গুলি ।
লাল বর্ণ মদের গ্লাস ভেঙে শান্ত গোল গ্রামটির কাছে গিয়ে বলি ; 
এই গ্রামের নাম হবে ,আমার প্রেমিকার নামে ।
                                     হো হো হাসলো নাগা তরুণ সন্ন্যাসী 
তোমরা জানাও তোমরা প্রস্তুত আছো ,
                           সমর্থন করে তোল তোমাদের পাপ হীন হাত গুলি  
তারপর দেখো , আমি ছিঁড়ে আনবো খুব মধ্যরাতে -
অন্ধ শাসকের শাদাহাড় ,বিষনখ উড়োচুল আর আদিম গুপ্ত আঙুলগুলি ।

হীরক ভট্টাচার্যের কবিতা 


উদ্ভাস 

ভোর হোল কৌষেয় ।
আমি কোল বালিশের কোল খুঁজে 
সরিয়ে নিলাম উত্তাপ দূরে 
ফুসফুস ভরে তুলো আঁশ 
                     উড়ছে , ভাসছে কষ্ট । 
কুয়াশায় বুনো কাঠবাদামের গাছটায় 
গনেশ পাইন কাকে এঁকে গেল আবছা !
ডুব দিই পানকৌড়ির মতো টুপটুপ ;
                     ঐ অঙ্কুরে কেঁপে উঠবো ?
সাদা অরণ্য ছই নেড়ে যায় ছপ্ ছপ্
পুরোণো পুঁথিরা ঘুমে তর্জনী মোচড়ায় 
কাকে রাখি ভেবে , আমি নির্বিষ গুনচট‌্  
                     কুঁকড়ে ছিলাম একলা ।
কেন দরজায় টুকরি সাজিয়ে
খুনী পাটক্ষেত , ছেঁড়া পত্রালি
ঘণ্টা দুলিয়ে দমকল রঙ সপ্তক্ ?
                      শোন উদ্ভাস
                      আর ভেসে উঠবো না । 

Saturday, 19 July 2014

সঞ্জীব প্রামাণিকের কবিতা 


দেওয়ালি 

সবাই জ্বেলেছে দীপ রাত দশ কি এগারো বারোটায় ।
শুধু যা জ্বলেনি আমরা ক'জন বন্ধু আজ তা জ্বালাবো 
আজ থেকে ঘোর অন্ধকারে কলঙ্ক বলে থাকবে না কিছু আর ।
কতোদিন সিগারেট পুড়েছে একা ।দূরে ছাইদানি 
বিছানার ছাইয়ের দাগ , সহ্য করে গেছি 

আজ সমস্ত পানীয় যেন মদ হয়ে ওঠে
আজ সমস্ত খাবার যেন মাংস হয়ে ওঠে - পর্ক বা চিকেন 
আজ একটিও দেশলাই কাঠি যেন না জ্বলে নেভে না 
  
মোমের গলিত আভা ,তার যে তরল , সাদা রক্তপাত থেকে 
যেন সংখ্যা হীন  কণ্ঠ শোনা যায়, আরো ,আরো সংখ্যাহীন
সবাই জ্বালালে দীপ , একদিন দেবতা এসে দাঁড়বেন দ্বারে ।

জমিল সৈয়দের কবিতা 


দুঃসাহস


বৃষ্টির নিচু গাছ এসে ঠেকছে মাথায় ,
ঘন ঝোপ , দুড়দাড় করে ঝরছে দু'চারটে পাকা বীজ ,
দূরের পথ পাড়ি দিয়ে আসা পাখিদের চঞ্চু থেকে 
গলগল করে বেরিয়ে আসছে সাদা ফেনা ,
প্রসারিত ডানার ঝাপটা লাগছে আমাদের শরীরে 
শেষ হয়েছে বোর্ডিংয়ে গ্রীস্মাবকাশ ,স্কুলের বাঁশি
                                        বাজতে শুনছি মাঝে মাঝে ।
কে জানে ঐ পিছ দরোজায় শুয়ে ডাকছে তক্ষক ,
ঠোঁটে  হাওয়ার হু হু নিয়ে ঘুরছে , চুলখোলা রক্ষকুলমাতা ,
চোখের বিদ্যুৎ দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে কোথায় আছে কৃতজ্ঞতা 
                      কোথায় নেই হারিয়ে যাওয়ার পলকা দুঃসাহস 
এখনই মেঘভার বয়ে নিয়ে ফিরে যেতে হবে দোতলা বাড়ির দিকে ?
পায়ে পেঁচিয়ে ধরেছে সাপের কুণ্ডলী ;
রাঙা চাঁদে জন্য অপেক্ষা করা যাবে না মধ্য রাত পর্যন্ত ?

মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতা 


মলমাস

আপতকালীন এই অঘ্রাণেও রক্ষীদের নিয়ে বসে বসে 
নক্ষত্র চেনান বুড়ো গবেষক -'ওকে ছুঁড়ে ফেলো বাঘ মুখে '
বিজ্ঞান ভবন থেকে আজ দেখা যাবে সারি সারি বেয়নেট 
কি জানি কখন সূত্র চুরি যায় । যেন মেঘ ওপর আকাশে,
আগ্নেয়গিরির ধূলো চাকা বাঁধা , মলমাস মলয় বহে না ।
রাণির বিমানে মোমবাতি । আর কতো ক্রোশ ? পাশের রাজত্বে 
তিনি ফেলে আসবেন একটি বেড়াল ছানা , মাথার ওপরে 
তার আগুনের নাচ , নিশান উড়িয়ে আগে চলেছে কপোত ।
 

Friday, 18 July 2014

বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়ের কবিতা 


ত্রাণ 

এই সুড়ঙ্গের ভেতর কবে এসেছিলাম মা ! আমার শরীর 
আচ্ছন্ন ধুসর ধুলোয় আজন্ম তুমি শুতে পারো না পাথরে 
দুমড়ে আছে তোমার হাত পা মেলতে পারো না গর্তে উপুড় হয়ে 
কাঁদে  তোমার সন্ততিদের বাড় নেই , ফোলা শরীর আরো ভেতরে তোমার 
করুণার ধূসর ধারা বয়ে যায়  আমি শুয়ে আছি জলশব্দে মেষশাবকের 
কচি কচি ক্ষুরের শব্দে .. এরই মধ্যে সন্তান সম্ভবা তোমার বৌ এই সুরঙ্গে 
আগমন হবে আরো একজনের ।

তাহলে এসো মা-আমার, জল্পনা করি আমরা , তোমাদের জন্য সারিডন 
ঘুম পাড়ানি গান তোমাদের জন্যে এসো আজ প্রার্থণায় বসি তোমার 
বৌয়ের জন্য সমস্ত রাত্রির যন্ত্রণা মনে হচ্ছে আজই উন্মুক্ত হবে 
অলৌকিক নীল আলোয় ..দেখো । তারায় ছাওয়া শুয়ে আছি নরম 
খড়ের বিছানায় মনে হচ্ছে উনিশো আশি বছর পর আজই 
প্রথম আকাশ দেখবো আমরা ।
     

অমিতাভ মৈত্রের কবিতা


 ভূত

 ঠিক একটা ভূতের মতো বেঁচে আছি 
সারাদিন কালো একটা শহর তার ধোঁয়া গলির ভিতর 
আমাকে ডাকে ।আমি ঘুরে বেড়াই একা একা একা 
কাঁধের ওপর ভারী হয়ে ওঠে কার হাত ,
মুুুুখ ফিরিয়ে দেখি এবং চিনতে পারিনা 
বুঝতে পারি আমার মতোই কেউ ।

বিকেলের দিকে অদ্ভুত একটা হাওয়া ওঠে শহরে 
আর ফাঁকা একটা মাঠে হাত পা ছড়িয়ে বসে থাকি আমরা 
বাতাসে উড়ে যায় টুকরো কাগজ , কুড়িয়ে নিই 
তারপর দুজনে গম্ভীর ভাবে খেয়ে ফেলি অক্ষর গুলিকে
সে আমাকে শেখায় কিভাবে হালকা ,ক্রমশঃ হালকা করে নিতে হয় নিজেকে 
বাতাসের মধ্যে কিভাবে একটানা ভেসে থাকতে হয় ।

সন্ধ্যে হলেই ভাসতে ভাসতে বাড়ি ফিরি 
ফেরার সময় নীল একটা মেঘ সঙ্গ দেয় আমাকে
হাসি পায় ,ভাবি বেশ মজা হবে যাহোক           
ভাবতে ভাবতে পৌঁছে যাই এক সময় ,দেখি 
নিচে অনেক নিচে ভেসে বেড়াচ্ছে আমদের ঘর 
ছোট্ট একটা খেলনা বাক্সের মতো ।

দেবদাস আচার্যের কবিতা 

প্রেম

এক কিন্নরী ,শূন্য শরীর , ভাসতে ভাসতে নেমে এল ছাদে 
সে চটপট আমার হাড়ে আগুন ধরিয়ে দিল 
আমি জ্বলতে থাকলাম , আর সেই আলোয় 
সে এক অলৌকিক নাচে মত্ত হয়ে রইল 

যতোক্ষণ আমি জ্বলতে পারলাম ততোক্ষণই সে নাচল 
এক সময় আমি পুড়ে ফুরিয়ে গেলাম আর দেখলাম 
কেউ নেই ,কিছু নেই ,শুধু এক মুঠো ভস্ম পড়ে আছে ,

সেই  ভস্ম দুই হাতে তুলে ফুঁ দিয়ে আকাশে উড়িয়ে দিলাম 







Thursday, 19 June 2014

আশির দশকের বিস্মৃতপ্রায়,ব্রাত্য ..আত্মমগ্ন দুই কবি রঞ্জন সরকার ও উৎপল দে ৷ 

রঞ্জনের কবিতার জগত বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে এক বিরল অনুভূতি ৷যেখানে পাতার ওপর তারাদের চোখ বিঁধে থাকে... সন্ন্যাসীর ধুনি  জ্বলে ওঠে মন্ত্রচ্চারণে ৷ আর সুদূর মানচিত্রের ব্যাপ্তিতে আবিষ্ট , মোহময় উচ্চারণে রঞ্জনের কবিতা কাঠের পুতুলের মতো ডুবিয়ে নেয় এক টাইম মেসিনে ..

 

 

রঞ্জন সরকারের কবিতা

 

গ্রাস

[]
জাল রহস্যের বুকে উঁকি মারে চাঁদ
পিশাচের গর্ভগৄহ ,বন, তাকে গিলে ফেলে মেলে ধরে পায়ের জমিতে 
রহস্য শুরু হোক -
পেনসিলভানিয়া থেকে ফেরা খনিযুবকেরা ক্যাম্প ফেলে আছে আজ গাছের তলায়
শিখা ও শিশির কণা  দোলে ,গ্রাস করে তাঁবু ,মাথা  
                                       কালো ঘাম ঝরে যায় পথে
অশ্রুত বাঁশির শব্দে জেগে উঠে পাথুরে মরদ ভাবে -
কাল ফিরে এল নাকি ?এতদিনে 
                    তবে এ শরীর ছেড়ে চলো ওই পারে ,উপকূলে
শৈশব,দূর স্মৃতি নিরঞ্জনে ফুল ও বালিকার দল মালা হাতে   
মনে হয় এখনো গলার কষ বসে আছে 
চকিতে ঘোরায় ঘাড়,মালিকেরা কেউ নেই   ফাঁকা তবে এই গ্রহ
ডেভিল্যাম্প ,পাগল চাবুক -প্রেতপুরী দূরে সরে যায় 
আট ঘন্টার শেষে ফাঁকতালে শুরু হোক নাচ !
অবসরে ভালোবাসা হবে ঢের,কুহেলী গুণ্ঠন খুলে ছুটে আসে   
রাত, বায়ু,মায়াকুমারীরা ;ডাক দেয়-ফণা তোলে 
শিখা ও শিশিরকণা ,এখনই সুযোগ বুঝে  ফেলে জাল ,গ্রাস করে তাঁবু 
সারা রাত একটু একটু করে খেয়ে নিলো সব্বার মাথা 
আয়ু ফুরোবার কালে জল রহস্যের বুকে ফের উঁকি মারে চাঁদ , দেখে যে 
বহুকাল পর আজ আবার মদ ও হৃদপিণ্ডের রস ডুবে আছে ক'জন মরদ          
             

শিখা                                                                                                                                                

[]

ঝড় থেমে গেছে সবুজ শিখাটি ফের ‍জ্বলে উঠে চরের জমিতে 
পাতার ওপরে ফিসফাস তারাদের চোখ বিঁধে যায়

কিছু ছাপ মাটিতে পায়ের,কে যেন গিয়েছে দূরে- দরমায় আঁচড়ের শব্দ
নীল ধূলো পার হয়ে নেমে আসে বায়ুযান ..হ্যাচ খুলে গেছে একে একে 
করিডোর ...করিডোর জুড়ে অন্ধকার 
পলিত বটের পাতা পড়ে আছে ,শাখাঝুরি..জ্জলে ওঠে সন্ন্যাসীর ধুনি 
মন্ত্রপাঠ কানে আসে..

তরঙ্গ উঠেছিল কবে 
আজ ঘর জুড়ে শুধু নৈঃশব্দ,দেয়াল মেঝেতে ধুলো জমে আছে 
দুজনেই চুপচাপ বলে , এরকম কতদিন ?
কতদিন আগে মেয়েটির চোখে জল , কাল ভোরে চলে যাবে ঘর ছেড়ে 
নাহারকাটিয়া ৷...দূরের সড়ক ঘুরে পথ গেছে ..বাস যাবে 
তারপর সংবাদ নেই 
মৃত ছেলেটির দেহ পাওয়া যায় পাটের পুকুরে , ভোরবেলা
সেই সাক্ষী জল ও নুনের ,তারপর সংবাদ নেই 
শুধু পথের ওপর পড়ে পুড়ে গেছে ধূসর, শরীর
সন্ধ্যায় গাঢ় চর

তারাদের চোখ জ্বলে, কবে  যেন এসেছি একা এদিকেই 
দূরে ব্রীজ শ্মশানের ওপাশে নদী..সকাল কি বিকেল ডুবে আছে কুয়াশায় 
একটি লন্ঠন জ্বলে রাতে ,মৃত কুঁড়ে ! যে থাকে তাকেও দেখে নি কেউ    
শুধু রাতে ,একটি চোখের ছবি ভেসে ওঠে 
কঠিন বিবর্ণ কেউ শিলালিপি লিখে চলে, হিজিবিজি হলুদ প্রলাপ 
সারারাত বিষণ্ণ রক্তের ধোঁয়া উড়ে যায় 
কতদূর নাহারকাটিয়া..

তারও আগে অচেনা অদ্ভুত আলো নেমে এসে পড়েছে মাটিতে,খিলানের কাঁচ বেয়ে 
নীচে বৃত্তাকার জমি 
বাঁকা শিং ভীষণ মহিষ থেকে দূরে বল্লম হাতে,কে এক বালক 
দারুণ যুদ্ধ হবে, লোকারণ্য..ভরে গেছে আম্ফিথিয়েটার 
সহসা চীৎকার করে যে ছুটে এসেছে , যেন সেই রাজার দুহিতা
ভীষণ মহিষ থেকে সরাবেই দূরে.. 
ওই যে বালক ! যেন তারই কেউ ছিল 
কতকাল আগে, কিংবদন্তীর ফল চুরি করে ঢুকে যেত ভূতের বাগানে ৷









উৎপলদের কবিতা

 

পদ্মগন্ধ 

কবি নই.. লম্পট হয়ে যাই ।চুমু খাই লক্ষীছাড়া ছুঁড়িদের 
কুলুঙ্গিতে কালি ওঠা পিলসূজ -পূর্বপুরুষের ।
থুথু লালায় মাখা সন্তান ।মোহিনী সাজা স্ত্রী
বলো, প্রতিদিন ভালো লাগে কারো !
এয়োতি সিঁদুর মাখা গাল ..ফিসফিসে কথা
কেউ নই কেউ নই , পদ্মগন্ধের ওমে মাতোয়ারা
মুখচোরা গেঁয়ো লোক বাড়ি ফিরি-শেষ রাতে ।




প্রসব

চার প্রহরের পর কেউ কথা বলছি না ..নেশায় নেশা 
চুল খসে , চোখে সিঁদুরের গুঁড়ো ।ভোরবেলা 
জ্বর আসে খুব ।মধুমতি চুল -আমাকে পাগল করে হাসে ।
নুন ছিটে দিই ..পিঠে কালসিটে 
মা আমার কবে বড়ো হবি , কবে সারিয়ে তুলবি আমায় !
দরজা আগলে কালু মাস্তান ..যদি না ই ফিরি 
সাট্টার দলে , মালের আসরে !

আজ , প্রদীপ নিবিয়ে দিই -ফুঁয়ে ।সিঁথি রাঙা 
পরীমেয়ে ঘুমিয়েছে পাশে ..হিরেকুচি রূপ ,
নাকছাবি জ্বলে ..জন্ম হয় ফুলপাখি , আনন্দের কুসুম..