অন্যদ্রাঘিমা

অন্যদ্রাঘিমা
প্রচ্ছদ - অদীপ ঘোষ

Monday, 21 July 2014

অন্যদ্রাঘিমা 

বিশেষ সংকলন ১৯৮৩

(নির্বাচিত অংশ) 

 

 

 

সূচীপত্র  

মণীন্দ্র গুপ্ত , দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় , রঞ্জিত সিংহ , দেবদাস আচার্য , কালীকৃষ্ণ গুহ , নারায়ণ ঘোষ , বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় ,

অমিতাভ মৈত্র , জমিল সৈয়দ , জয় গোস্বামী , সঞ্জীব প্রামাণিক , রাজকুমার রায়চৌধুরী , চন্দন মুখোপাধ্যায় , 

মল্লিকা সেনগুপ্ত , গৌতম বসু , অলোকনাথ মুখোপাধ্যায় , হীরক ভট্টাচার্য , 

রঞ্জন সরকার , উৎপল দে ।   

প্রচ্ছদ / অদীপ ঘোষ  

মূল্য - ৩ টাকা

মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতা  

জটিল ফাল্গুন 

অলখ্যের নড়াচড়া টের পাও ,মেধাবিনী ? 
গর্ভে কি মুষল ,নাকি আলোরশ্মি ? 
রাত্রি নীহারিকার ঘূর্ণিতে পড়ে গিয়েছিলে মুগ্ধ পাঁচ মাস 
যেন মেরু-বোরিয়ালিসের বিশাল পর্দার পাশে মাত্র দুইজন

কিন্তু যা নিয়ে ফিরলে ,তার সংজ্ঞা জানো ?
শুধু স্মৃতি - যেন জলের তলায় ছুরি , বাকি যা তা অনির্বচনীয়

বিকেলের কলে জল পড়ে যায় ...
পাড়ার সানাই বকুলতলার দিক থেকে
ছায়া সঙ্গে করে আসে ,তোমার উঠোনে
অবসন্ন সূক্ষ - লেস ব্রেসিয়ার মরালের মতো সাদা
ভেসে আছে হাতের কাছেই , তবু গা ওঠে না ।
শুুধু ওক পাতা , ঝরনার জল খেয়ে যে ছিল একলা
তার ছবি বই দড়ির হ্যামক গুছোতে যাবে না আর এবছর টিলার বাড়ীতে
সে এখন শূন্য ঘরে ভেবে যাচ্ছে জন্ম হ্রাস করার প্রক্রিয়া -
জানলা দিয়ে অবলোকিতেশ্বরের আলো আসে ,
টেবিল , চেয়ার , বই ,অলেপ , নরম 
সে এবং জীবনের ভুল শ্যাম-যমজের মতো মারাত্বক যুক্ত ছিলো ,
আজ কর্ড ছিঁড়ে , টেবিলেতে , পরস্পর বিদায় নেবার আগে
মুখোমুখি বসে আছে তারা ।

             বিকেলে কলের জল পড়ে যাক -
             টক চেরী খেতে ইচ্ছে করে ?
             অন্য গন্ধে শরীরে বিষাদ উঠছে ভরে ।
             গর্ভের ফুলের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা পাখী অন্ধকারে ডাকে
             পাখী ডাকে ।     

দেবীপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায়ের কবিতা

মাঝ-পরিচ্ছেদ 

ফাটা শান বোবানো বিছনায় 
ভাঙাচুরো অসুখ নৃহাড় ।
দুপুর খস্ খস্ টানা মাঝ-পরিচ্ছেদে 
শুকনো ঝুর্ ঝুর্ করছে খসা ডানা ডাল ,
দ্রব হয়ে যায় নির্বাতাসে ।
মা তার সন্তান তার বাবা 
সুন্ সান্ সড়ক ছেড়ে পোকার জঠরে 
পোকা হয়ে ঢুকে গেল । ঘড়ি 
স্থির করে দেখছে  বিশাল নাইনল 
ফাঁসনল পেতে বসে ব্যাধ ।
নর নয় পক্ষধর নয় । 
আহ্লাদ উগরে চারধার জুড়ে নড়ে চড়ে ওঠে 
ভাঙাচুরো অসুখ নৃহাড় ।
কার ? কবে কার ? কারো নয় । 
দুপুর খস্ খস্ ঝুলছে মুখের ওপর । 



কালীকৃষ্ণ গুহের কবিতা

সাইকেল রিক্সা 

রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে যখন পেয়েছি ভয় , তখনই 
সাইকেল রিক্সা উড়ে এসেছিল ।
রিক্সার চালক ছিলো কৈশোর অতিক্রান্ত , বুদ্ধিমান ,আর্ত স্বপ্নচারী ।
সেই আনলো পরীদের দেশ থেকে আমাকে এখানে - প্রতিবেশী অন্ধদের পাশে ।

এখন এখানে সকলকেই ধীরে ধীরে চিনতে পারছি ।

 জয় গোস্বামীর কবিতা 

ক্ষত

তুমি যে আমার ছাল চেঁছে নিলে আঙ্গুলে , নখরে , ছুরিকায় 
আর কাটা জায়গায় মাখালে যে রান্নার লবণ ,
তুমি শুধু একা নও , তোমাদের তিনভাই -দু'বোন
সবাই যে আমাকে দিয়ে আঁচ দিলো ঘরের আখায় ,
বের করে নিলো কয়লা - আমি কি কিছু বলেছি একবারও ? 
শুধু পথে পড়ে আছি মৃত-শামুকের ভাঙা খোল , 
ফের যদি ছুঁতে যাও অন্য কোনো গাছের বাকল  
পায়ে ঢুকে যাবো সোজা - যাতে তুমি দাঁড়াতে না পারো !

চর্বিরা কুঞ্চিত হচ্ছে , আমি দেখবো , মাংসেরা আমাকে
চেপে ধরছে বারবার । ভিতরে ঘনতর পুঁজে
ভরেছে আঙুরফল । রূপোরস গলানো লাভায়
আমি যেন গেঁজে উঠছি । রক্তবাহী প্রধান শিরাকে
চিনে বের করছি আমি ,আর তার মাদক আভায়
মুগ্ধ হয়ে উঠে যাচ্ছি তোমার হৃদপিণ্ড খুঁজে খুঁজে ..

রঞ্জিত সিংহের কবিতা

আত্মজীবনী মূলক

লক্ষ ওয়াটের বাতি জ্বলছে তার দেহে ।
মনে হচ্ছে ,ক্যামেরা প্যান্ করতে করতে 
হঠাৎ বিশাল ঝাড় লণ্ঠনের সামনে আমাকে 
দাঁড় করিয়ে দিয়েছে । 
ক্রমে ঘিরে ফেলছে দীপগাছ
স্ফুলিঙ্গের পত্ররাশি -
'ভয় কি ,আমি তো রয়েছি এখনো্ ,
মাভৈ বলে এবার এগোও ,এগোও '।

কিন্তু আমার এ চামড়া-মোড়া এ বাসায় কখনো
ইলেকট্রিক ওয়েরিং হয় নি । হ্যাঁ ,মিস্ত্রি ও দেখে গিয়েছিল ।
হেসে বলে গেছে -এ যে স্যার ,চামড়াও নয়  সবটাই মাটির
এতে আলো জ্বলবে না ।

মনে পড়ল , ঠিক ঠিক ,উনি তো বলেছিলেন ,
মজবুতি দেয়াল বানাও ,
হাড়ে ইঁটের গাঁথনি ,মাংসে পলেস্তারা ।
তারপর ওয়েরিং সহজেই হয়ে যাবে ।
বাতি জ্বলবে -ঝাড়লণ্ঠনের রাজ রাজেশ্বর আলো ।

রাবণের যেমন স্বর্গের সিঁড়ি করা হল না অথচ
সীতা হরণে একটুও তর সয় নি ,তেমনি আমার দেয়ালও
পাকা হল না ,বিজলীও জ্বলল না ।
অথচ ক্ষোভ দুঃখের ভুসোকালির অন্ধকার রঙে
একটা চওড়া ড্রপ সীন বানিয়ে ফেলেছি ।
দরজা নেই , দরজা মতন  একটা ছোট ফোঁকরের মধ্য দিয়ে
রোজকার চলাচল ।
মাথা নিচু করে সকালে সুড়ুৎ করে বেরিয়ে সন্ধ্যায়
হেঁট মুণ্ড-সেই ভাবে ঢুকে পড়ি ।
চোখ বুঁজলে দেখি , একটা মস্ত বড় বাতি শূন্য পথে
আকাশ পেরিয়ে চলে যাচ্ছে ভাসতে ভাসতে
হাত বাড়াচ্ছি ..হাত বাড়াচ্ছি ..
কিন্তু কোথায় কি ?    

গৌতম বসুর কবিতা

হাসপাতাল

১
একজন ছুঁয়ে থাকে তার জরা , চশমার খাপ 
দেখতে দেখতে বস্ত্রে বাক্স ভরে ওঠে ; যাকে 
ভিন্ন দেশে যেতে হবে তার চিরুনী ,
সংবাদপত্রে মোড়া গেলাসে অন্য পথে যায় 
ফিরিয়ে আনে ঘাতক মেষপাল ।

২
এই রোদ , লক্ষ্য করো ,শ্বেতাঙ্গিনীর শব্দে
চোখ মেলছে ,দৃষ্টি আমার দিকে নয় 
দেয়ালের দিকে নয় , আলো স্যালাইনের 
বোতলে প্রবেশ করে ক্ষীপ্র গতি লাভ করছে 
এইভাবে রশ্মি ও জলের ফাঁসি সংগঠিত হয় ।